স্বপ্ন (Dream)

Please note: All the contents are present in this blog including poems, stories, information (excluding the template) are complete artwork and under the copyright of Pronil Halder. Publishing, modification, tampering, merging, editing etc. without author's permission is unwanted and illegal.

দুর্জয়ের সপ্তাহখানেক আগেই বিচ্ছেদ হয়েছে পূর্ণিমার সাথে আজকালকার অতি তুচ্ছ এক ঘটনা এই আধুনিক যুগে প্রেমে পড়াটাও যেমন স্বাভাবিক, সম্পর্ক ভাঙাও ততটাই যেন স্বাভাবিক সংখ্যায় ভারী মানুষের কাছেই সম্পর্কথেকে বেড়িয়ে আসা অতি সহজসরল একটা হিসেবের মতো দুর্জয় সেই সব গুটিকয়েক মানুষের মধ্যে পড়ে যারা এখনো সম্পর্কের মূল্যকে এত সহজে বিকে যেতে দেয়নি

লয়্যাল শব্দটি আমরা আজকাল অনেকেই প্রকৃত সম্পর্ক বোঝাতে ব্যাবহার করি কিন্তু এই শব্দটির শক্তি অনুভব করতে বহু বছরের মানসিক পরিশ্রমের প্রয়োজন। একমাত্র একজন স্থিরবুদ্ধির মানুষই জানে এর অর্থ। হয়ত একটি পোষ্য কুকুরও জানে। এটা মানতে লজ্জার কিছুই নেই।

যাই হোক, সেই লয়্যাল দুর্জয়ের দাগ না পড়া সাদা কাপড়ের মতো মনটাকে এই নিয়ে দ্বিতীয়বার কেউ তোয়ালে ভাবল। আর স্বপ্নের শুরু এখানেই।

দুর্জয়ের ভালোবাসা যাকে বলে, এ জগতে কোনো দুর্ল্ভ রত্নের মতো। অনেকেই তার দাম দিতে পারেনা বা কল্পনাও করতে পারেনা। কিন্তু দুর্জয় সেসব থেকে যথারীতিই সন্দিহান। সে সরলভাবে ভালোবাসে। ভালবাসা প্রকৃতপক্ষেই সরল একটি কাজ। সোজা হিসেবজটিল শুধু আমাদের মন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই জটিলতার মারপ্যাচে আমরা খুব সুন্দর একটি সম্পর্ককে হারিয়ে ফেলি। যদি সকলেই সরলতম শিশুর মতো করে ভালবাসত, এ বসুন্ধরায় আর কোনোদিনই হয়ত কোনো সম্পর্ক আর ভাঙত না। তবে সেটা হয়না সাধারণত। বিরহযন্ত্রনারও প্রয়োজন আছে বৈকি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে বলে গিয়েছেন,

“বিচ্ছেদের আঘাত না পাইলে মিলন সচেতন হয়না।“

বিচ্ছেদের আঘাত সইবার ক্ষমতা বা অভিযোজন মানুষের অন্তরেই থাকে। কিন্তু দুর্জয়ের ক্ষেত্রে এসব কথা খাটে না। সে শুধু ভালবাসতেই শিখেছে। সে এ জগতেই যেন এসেছে ভালবাসতে, বিচ্ছেদের জন্য নয়তার অস্ত্বিত্ব সবার কথা রাখতে। তাই যখন তাকে কেউ কিছু বলে, সে শুধু মেনে নিতেই পারে।

দুর্জয় আগেও একবার বিচ্ছেদযন্ত্রনা অনুভব করেছে। সেবারও কষ্ট পেয়েছিল। কিন্তু সেবার সে কাঁদবার মতো, চোঁখের জল ঝরানোর মতো জীবন্ত অন্ততঃ ছিল। এবার সে লেশহীন। সে বন্ধুদের সাথে আড্ডা মারছে, মজা-মস্করা করছে, বিচ্ছেদের কথা খুব সহাস্যে নিচ্ছে, কিন্তু অন্তরে সে দাহ্যমান। এতটাই পুড়ে গিয়েছে সে যে, তার জীবনশক্তিও তাকে শান্তনা দিতে ব্যার্থ। চোঁখের জল বা মনের দুঃখের মতো সাবলীল, স্বাভাবিক অনুভূতিগুলিও হাত গুটিয়ে নিয়েছে। বাস্তবজীবনে যা যা সে চায় তার সবগুলিই সে খুঁজে পাচ্ছে স্বপ্নে। হ্যাঁ, ঘুমিয়ে আমরা যে স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্ন।

দুর্জয় ইদানিং কিছু স্বপ্নের চোরাবালিতে আটকে পড়েছে। মহাপ্রবল তার টান, অকল্পনীয় তার শক্তি। ব্যাপারটা খুলেই বলি।

বেশ কিছুদিন যাবতই দুর্জয় সকালে, ঠিক ভোরের দিকের গভীর ঘুমে পরপর রোজ একই স্বপ্ন দেখে চলেছে। সবগুলিই তার পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে। বিচ্ছেদের পরেও সে প্রানপণ চেষ্টা চালিয়ে গেছে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য। ফেসবুকে একের পর এক ম্যাসেজ করে গেছে। কিন্তু এটাই পরিহাস এবং কঠোর বাস্তব, একসাথে চলার মতো সুবিশাল দায়িত্বের ভাগ নিতে যে একদিন রাজী হয়েছিল, প্রয়োজনে আজ সে কতটা নির্মম যে সে দুর্জয়ের পাথর গলিয়ে দেওয়া আর্তনাদের সামনেও নিশ্চল। সে আজ তাদের সম্পর্কের সকল অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছে! মানুষের ঠিক এই স্বভাবটাই যে ভালবাসার সময় কোথায় থাকে, সেটাই মহারহস্য।

আগে তো তাও রিপ্লাই আসত, ইদানিং তাও আসে না। এখন সিন ও হয় না, আর তাতেই দুর্জয় হয়ে ওঠে আরো ব্যাকুল, আরো বেশী পিপাসার্ত। সেই সব বঞ্চনা থেকে ক্ষণিকের জন্য মুক্তি পায় সে স্বপ্নে। এই যেমন সেদিন দেখল,

‘সে আর পূর্ণিমা একটি চলন্ত রিক্সায় বসে আছে। বিকেলবেলা, মানে সন্ধ্যা নামবে হয়ত আর এক ঘন্টার মধ্যেই। সূর্য পাটে বসেছে।

“এটি কোন জায়গা থেকে রিক্সাটি চলেছে?”

একটি রাস্তার ওপর দিয়ে। দুপাশে ছোটখাট বাড়ি পড়ছে মাঝে মাঝে। ব্যাক্তিগত জমিতে গাছের সারি বা জঙ্গল হয়ে আছে। মাঝে মধ্যে দূরে মাঠও দেখা যাচ্ছে। শহরের বাইরে সেটা নিশ্চিত কারন কোনো উচু ইমারত বা ফ্ল্যাট দেখা যাচ্ছে না দূর অবধি। ঠান্ডা ঠান্ডা একটা হালকা হাওয়া দিচ্ছে। দুপাশে মাঝে মাঝে দু-একটা শাটার দেওয়া দোকানও পেরিয়ে যাচ্ছে। বাংলাতেই লেখা সাইনবোর্ড। অত তার মনেও নেই কি লেখা ছিল তাতে।

স্বপ্নের ঘোর চলতে লাগল। পেছনে আরেকটা রিক্সায় তাদের মালপত্র আসছে। পূর্ণিমা তার কাঁধের ওপর মাথা এলিয়ে শুয়ে আছে। এই কাছে পাওয়ার অনুভূতিটিই দুর্জয়ের অত্যন্ত শান্তিদায়ক মনে হল। সে যে কি প্রশান্তি অনুভব করছে, সেই জানে। ওর গন্ধ, ওর স্পর্শ যা সবকিছুর জন্য দুর্জয় এতদিন কাতরেছে, এতদিনে তারা ফিরে এসেছে। তার সব কষ্টের শেষ হয়েছে। খারাপ সময় কেটে গিয়েছে।

রিক্সা চওড়া পথ ধরে এগোতে লাগল নানা বাঁক পেড়িয়ে শেষমেশ রিক্সাটি একটি জায়গায় এসে থামল যেখানে রাস্তাটা প্রায় ৯০° ঘুরে গিয়েছে ও আরো অনেকদুর চলে গিয়েছে। একটি বাড়ি রাস্তার বাঁ পাশেই। একটা বড়ো সাইনবোর্ড বাড়ির সামনের দেওয়ালে টাঙানো। ঠিক কি লেখা ছিল তাতে... দুর্জয়ের মনে নেই। অন্য রিক্সা থেকে মালপত্র নামানো হল। রাস্তাটা একটু উঁচু, মানে রাস্তার ধারগুলি দুপাশে বাড়ির দিকে নেমে গেছে। তার মানে এই নয় যে বাড়িটা রাস্তা থেকে দূরে। বাড়িটা রাস্তার সাথে লাগানোই।

বাড়ির দরজাটা খুবই সরু এবং নীচু। পাশে একটা বিশাল শাটার আছে। ওই শাটারের পেছনেই হয়ত কোনো দোকান থেকে থাকবে যার জন্য সাইনবোর্ডটা রাখা বাড়ির সামনে। বাড়ির ভেতর থেকে একজন এসে হাসিমুখে কিছু মালপত্র নিয়ে ভেতরে চলে গেল। বাকীগুলো ওরা বইল। দুর্জয়ের দুহাতে স্যুটকেস, গলায় বোতল এবং আরো কিছু।

বাড়ির ভেতরে যেতে হলে একটা সরু প্যাসেজ পেরোতে হয়। প্যাসেজের দুপাশে ঘর আছে ছোটোখাটো, এছাড়া বাথ্রুম, মানে যেটাকে আমরা সাধারণত কলতলা বলি। ভেতরে চৌবাচ্চাও চোঁখে পড়ল। প্যাসেজের ওপরে বাল্ব যেটাকে দেখে অনেক পুরোনো মনে হল। বাড়ির সুইচবোর্ডে আদ্যিকালের লগ্‌ লাগানো সুইচ।

ওরা প্যাসেজের শেষে একটা বিশাল ঘরে এসে পৌছল। সরু প্যাসেজের দম্‌ আটকানো অনুভূতি পেরিয়ে এখানে এসে একটু খোলা বাতাস পেল দুর্জয়। সেখানে দেখল মেঝের ওপর বাড়ির মহিলারা সব্জি কাঁটছে। কেউ বটি দিয়ে টুকরো করছে, কেউ মসলা বাটছে শিলনোড়ায়।

পূর্ণিমা এদের সাথে কথা বল্‌ল। কি কথা হচ্ছিল, কিছুই মনে নেই দুর্জয়েরএটূকু স্পষ্ট যে স্বপ্নে যুক্তিগত মন বা ইংলিশে যাকে বলে ‘লজিক্যাল মাইন্ড’, সেটি অবচেতন হয়ে যায়। না হলে দুর্জয়ের শব্দ, বর্ণ এসব মনে না থেকে ধানক্ষেত, রাস্তা এই সবকিছু মনে আছে।

এরা ওদের আসাতে খুব খুশি এবং যতদুর মনে হল এরা ওদের জন্যই অনেক্ষন অপেক্ষা করছিল।

“ঘরে এত সব্জি কাঁটা, মসলা বাটা, এত কর্মযজ্ঞ কি তবে আমাদেরই জন্য?”

দুর্জয়রা মালপত্র সব ওখানেই নামিয়ে রাখল। ঘরের সোজাসুজিই আরেকটা দরজা, যেটার ওদিকে আরেকটা ঘর যার মধ্যে থেকেই একটা সিড়ি ওপরে উঠে গেছে। পূর্ণিমা একটা হালকা ব্যাগ নিয়ে ওপরে চল্‌ল। দুর্জয়ও চল্‌ল ওর পেছনে। ওপরে গিয়ে যতদুর মনে হল এটা একটা চিলেকোঠা ধরনের ঘর। ভেতরটা যদিও খুব সুন্দর মেয়েলি গোলাপী রঙে রং করা। অনেক টেডি বেয়ার ও পুতুল সেখানে। নিচের ঘরটাতে, মানে আগের সব্জির ঘরটা পেরিয়ে যে ঘরটা, সেখানে কিছু প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র রাখা।‘

এখানেই দুর্জয়ের স্বপ্নের শেষ। সে জানেনা এমন জায়গা কোথায় আছে। তার সবকিছু অত্যন্ত নিঁখুতভাবে মনে আছে, যা থেকে বোঝা যায় কতটা গভীর সে স্বপ্ন।

এরকম একটার পর একটা স্বপ্ন সে দেখেই চলেছে রোজ। যখন দুর্জয়ের ঘুম ভাঙছে, তখন সে তার বেদনাকে আরো গভীরভাবে অনুভব করছে। যে পূর্ণিমা, কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত এত কাছে ছিল তার, সে যে আসলে শুধুই এক ছলনা, এক মায়া, একটি ধোঁয়াশার মতো যাকে ধরা সম্ভব নয়, সেটা যখন সে বুঝতে পারে, সে আরো ভেঙে পড়ে। সে অনুভব করে, যেন কোনো এক কাঁচের পুরু দেওয়াল দিয়ে পূর্ণিমা ও তাকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। মাঝে ব্যাবধান অতি সামান্যই, কিন্তু তাও, কঠোর বাস্তব এটাই যে সে অনেক দুরে। সে পাগলের মতো দেওয়াল আছড়াতে থাকে। প্রতিদিন আগের দিনের থেকেও সে আরো বেশী তৃষ্ণার্ত হতে থাকে।

সে ঘুম ভেঙে আবার পূর্ণিমাকে ম্যাসেজ করে এবং আবারও বাস্তবের সম্মুখীন হয়। তার অন্তরের কোমল হৃদয়টি হাপুস-নয়নে কাঁদতে থাকে। প্রতিটা স্বপ্নের শেষে যখন তার ঘুম ভাঙে, সে অনুভব করে যেন সে এইমাত্র অঝোড়ে কেঁদে উঠেছে। তার নাকের কাছে শীতল ভাব, ভিজে স্যাতস্যাতে মন ও বুকের কাছে কাঁপুনি... ওর মনে তো ভালবাসা ছাড়া অন্য কিছুই ছিল না? সে তো একবারও ওর খেয়াল রাখা ছাড়া একবর্ণও অন্য কিছুই ভাবেনি? সে তো সেই সবকিছু অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে যা একজন আদর্শ পুরুষের সত্যিই করা উচিৎ। কেমনতর বিচার এটি? ভালবাসতে গেলে তো এত যুক্তি সামনে রাখা হয় না, তবে ভাঙতে গেলে কেন? কেনই বা এমন নির্মম হয়ে ওঠে একজন সব নিয়মমাফিক করলেও? পূর্ণিমা শেষবার ওকে এটাই বলেছিল,

“আমি জানি তুমি সব দিক থেকে যোগ্য। তবুও আমি তোমাকে সুযোগ দেব না কারন এটা আমার ইচ্ছা এবং আমার সিদ্ধান্ত যেটা নেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে।“

দুর্জয়ের মনে হয়েছিল এ যেন এক পরীক্ষা যেখানে সে সবকিছু পেরেছে এবং ভালো ফলাফল তার প্রাপ্য, কিন্তু তবুও তাকে পাশ করানো হল না, তার কারন ইচ্ছা। তার মনে হয়েছিল কেউ যেন তার  আসীম ধৈর্য্য সহকারে গড়া তাসের ঘরকে ইচ্ছে করে ভেঙে দিয়ে এক বিদ্রুপের হাসি রেখে চলে গেল।

স্বপ্নের চলচিত্র শেষ হল না। সারাদিন সে যতই নিজেকে সামলে রাখে, ঘুমের মধ্যে মন তাকে সেটাই দেখায় যেটা তাকে আরো উন্মাদ করে তোলে। একদিন দেখল সে,

‘একটা চালাঘর, মানে পাঁকা বাড়িই কিন্তু ছাঁদ অ্যাডবেস্টারের। তার স্বপ্নের বৈশিষ্ঠই হল সবসময় পড়ন্ত বিকেল বা ভোরের সময়কার স্বপ্ন দেখে এবং বাস্তবেও ওই ভোরের দিকেই শুরু হয় তার স্বপ্নের পর্ব। সে দেখ্‌ল, দুদিকে সুন্দর বাগান। এ বাগান সম্পূর্ণভাবে কৃত্তিম নয়। হয়ত জঙ্গলের খানিকটা অংশ কেটে বানানো হয়েছে। কিছুকাল যাবত হয়ত বসতি শুরু হয়েছে এখানে এবং সেই কারনেই এই গুল্মঝোপের বাগানের অস্তিত্ব। অনেকটা চা বাগানের মতো সেই বাগান সর্বত্র হালকা কুয়াশাবৃত। ভোরের আলো এই কিছুক্ষণই হল মেলতে আরম্ভ করেছে। সেই বাগানকে কেটে চলে গেছে এক সরু হাতে গড়া চলার পথ। ওই পথ বরাবরই একটু দুরে কয়েকটি নারকেল গাছ দেখা গেল ভোরের আঁধো আলো আঁধো অন্ধকারে। কানে এল দূর থেকে ভেসে আসা রেডিওতে বেঁজে চলা কোনো সঙ্গীত।

সে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সেদিকে চলতে লাগল। সেখানেই সে খুঁজে পেল বাড়িটিকে। বাড়ির পেছনদিকে গিয়ে রাস্তাটা শেষ হয়েছে। সেখানে তুলসীতলা, স্নানের জায়গা। তুলসীবেদীতে রাখা ফুল, ধূপকাঠির শেষাংশ, সিঁদুর। অনেকরকমের গাছ এখানে। বাড়ির চাল থেকে লাউ গাছে লাউ ঝুলছে। সেখানে পূর্ণিমার বাবা-মা পাথরমূর্তি হয়ে দুর্জয়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্থির ও নিশ্চল। বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে দুর্জয় ভেতরে ঢুকতে দেখল বিছানার ওপর পূর্ণিমা বসে আছে।‘

সে ক্রমে নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে এইসব স্বপ্নের জালে। এখানে সে সেই সবকিছু পায় তার যা প্রয়োজন। তার ভালো লাগে এই ভোরের আলো, এই নিস্তব্ধতা, এই ঘোর। তার ভালোলাগে এই জগত যেখানে নেই বাস্তবের টানাপোড়ন। যেখানে সবই খুব মোহময়ী। দুর্জয় সেখানে নিজের শরীরকে অনুভব করতে পারে না। সে যেন কোনো ওজনশূন্য, শরীরবিহীন দর্শকমাত্র।

আমাদের জীবন্ত হওয়ার ফলে কিছু মহৎ শক্তি বা ক্ষমতা আছে যার একটা হল, আমরা ঘুম থেকে জাগতে পারি। আমরা অত্যন্ত জীবন্ত, মানে আমরা কিছু ধরলে সেটাকে অনুভব করতে পারি, সেটার দৃঢ়তা, তাপমাত্রা। আমরা অনেক বেশী দ্রুত। বাস্তব জীবন, বা স্বপ্নের বাইরে যে জীবন, যা আমরা ঘুমিয়ে দেখি না, সুস্থ মস্তিষ্কে দেখি... তাকে বলা যাক শরীরী জীবন, এটা অত্যন্ত দ্রুত। এখানে ব্যাখ্যার জন্য স্থান আছে। এখানে চিন্তাভাবনার ক্ষমতা আছে। এবং এই জীবনীশক্তির এত জোর, যে আমরা ঘুম থেকে জাগতে পারি। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের মায়া থেকে ঠিক এই জীবনসত্বা আমাদের বাস্তবে তুলে আনেই। এই ঘুম চিরকালের জন্য হয়না তাই। স্বপ্নের মোহময়ী, অশরীরী জগতকে হার মানতে হয় এই সত্বার সামনে। হয়ত বাস্তব জীবন স্বপ্নের জীবনের মতো সবসময়ে মনের মতো জিনিসগুলিকেই স্থান দেয়না, কিন্তু এর নিজস্ব বল রয়েছে, নিজস্ব বর্‌ রয়েছে, রয়েছে নিজস্ব সুযোগ-সুবিধা। তাই যতদিন আছি আমাদের উচিৎ এই জীবনানুভুতির আঁশ অবধি আনন্দ করে নেওয়া কারন, একটা দিন সকলেরই আসবে, যখন আমাদের এই স্বপ্নের রাজ্যেই চিরতরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে হবে। যেদিন জীবনশক্তি আর পেরে উঠবে না, কয়েক লক্ষ জয়ের পর একটা হার স্বীকার করেই নেবে।

দুর্জয়ের আর প্রয়োজন নেই সজীবতার। সে স্বপ্নের সাথে অত্যন্ত একাত্ব হয়ে পড়েছে। সে এই আচ্ছন্নতাকে ভালোবেসে ফেলেছে। স্বপ্নের মাঝ থেকে কেউ তাকে জাগিয়ে দিক, সে আর তা চায় না। সে চায় সেই জগতেই বসবাস করতে, পাকাপাকিভাবে। সে আর ওজন চায় না... অনুভুতি চায় না... চিন্তা চায় না... যুক্তি চায় না। সে আর চায় না তার চোঁখে জোরালো আলো পড়লে তার চোঁখ কুঁচকে যাক। সে পূর্ণিমাকে চায়... সে মুক্তি চায়... সে ভেসে বেড়াতে চায়। সে চায় পরলৌকিক প্রশান্তি।

ফ্যানে লাগানো দড়ি থেকে যখন দুর্জয়ের দেহটা ঝুলে পড়ল তখন প্রথম কয়েক মূহুর্ত তার জীবনসত্বা সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাকে জাগিয়ে রাখতে। সেই মহাবল তাকে কিছুতেই চোঁখ বন্ধ করতে দেবে না! কিন্তু এই যুদ্ধে জীবনের হার আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। কি করে জিততে পারত জীবন যেখানে তার আশ্রয়দাতা, দুর্জয় নিজেই মৃত্যুকে পক্ষ দিয়েছে...

মারা যাওয়ার সময় হয়ত খুব কষ্ট হয়। দুর্জয়ের সে ভুল ভাঙল। কষ্ট তো শুধু কয়েক মূহুর্তই স্থায়ী হল, কিন্তু তারপরই, খুব অদ্ভুতভাবে আস্তে আস্তে তার খুব আরাম বোধ হতে লাগল। সেই প্রশান্তি ক্রমশ মাথা থেকে পা অবধি তাকে বিলীন করে দিল। সে কি চরম শান্তি! সে তার দেহসত্বাকে হারাচ্ছে! তার দেহের অনুভূতি ক্রমশ লোপ পাচ্ছে। সে যেন ক্রমশ হালকা হচ্ছে, আরো হালকা। সেই স্বপ্নের জগত, যাকে সে ঘুমিয়েও সেদিন দেখেছিল, সেই জগতে প্রবেশ করছে সে। তার চোঁখের সামনে এক উজ্জ্বল, স্নিগ্ধ জ্যোতি। সেটা বাড়তে বাড়তে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেল্‌ল। সে উত্তীর্ণ হয়েছে চিরস্বপ্নের দুনিয়ায়। সে জীবন ও মৃত্যুর মাঝের দরজাটি পেরিয়ে এসেছে। তার সামনে সেই ভোরবেলার আকাশ, কুয়াশা, সেই নিস্তব্ধতা। এখানে ভাষা নেই, কারন এখানে চিন্তাশক্তি নেই। এটা দরজার অন্য পারে। জীবনশক্তি থাকলে এই মায়াবী জগতে থাকা সত্ত্বেও দুর্জয়কে ঠিক তার বলিষ্ঠ মুষ্ঠি আবার দরজার এপারে নিয়ে আসত। আজ আর তা হবে না।

মৃত্যুর পর সে প্রানের অর্থ বুঝল। প্রান হল সেই অশরীরী ও ওজনশূন্য ধারনা এবং শরীরের মধ্যে মাধ্যমমাত্র, যা প্রকৃতপক্ষেই শরীরের পক্ষপাতিত্ত্ব করে। এবং করে বলেই আমরা এত সুন্দর একটা সুযোজ পেয়েছি এই বাস্তবতার। নিজের অস্তিত্বকে অনুভব করার সুযোগ। দুর্জয় যে সুযোগ নস্যাৎ করেছে।

দুর্জয় তার স্বপ্নের জগতে ভেসে যেতে লাগল আরো দুরে, আরো দুরে... কোনো দড়িতে সে যে আজ নেই বাঁধা!


Comments

Popular posts from this blog

Being Innovative

Universe