স্মিতার অভিশাপ

স্মিতা ঠিক করে ফেলল।

ওর আর মন বসেনা নীলের সাথে। প্রথম প্রথম প্রোপোজালের সময়ে যেরকম টানটা অনুভব করেছিল সেটা আর স্মিতা অনুভব করেনা। কেন, সেটা স্মিতা নিজেও নিজেকে বহুবার জিজ্ঞেস করেছে। কোনোবারই একটি যথাযথ সদুত্তর খুঁযে পায়নি। সে জানে, সে খামখেয়ালি। এই কথাটা নীল তাকে বরাবরই বলে। হঠাৎই ঠিক এরকমই অনুভুতি হয়েছিল তার এক্স-বয়ফ্রেন্ড অমিতের সাথে, যার জেরে স্মিতা সম্পর্কটা ছেড়ে বেড়িয়ে আসে। যদিও সে কখনোই চায়নি যে সম্পর্কটা ছেড়ে যাওয়ার পরেও অমিত তার জীবন থেকে চলে যাক। কারণ হয়ত স্মিতার খামখেয়ালিপনাই। যতটাই সে অমিতের প্রতি অনুভুতি হারাচ্ছিল, ততটাই আবেগের জালে জড়িয়ে পড়ছিল নীলের সাথে। নীল স্মিতার বেস্ট-ফ্রেন্ড। যদিও নীল স্মিতাকে বরাবরই ভালোবাসে তাও মনের মধ্যেই চেপে রাখে তার ভালোবাসাকে। কারণ সে জানে, স্মিতা তো অন্য কারোর  এই অনূভুতি প্রকাশের তার কোনো অধিকার নেই। তবুও ফাঁকফোকর থেকে ভালোবাসার জ্যোতি যে বেড়িয়ে পড়ত না, তা নয়। আর স্মিতাও প্রথম থেকেই জানত, নীল ওকে ভালোবাসে।

একদিন নীল আর না পেরে বলেই ফেলল। বলেই ফেলল যে সে স্মিতাকে ভালোবাসে। সে এটাও জানে যে স্মিতা তার নয়। আর এরকম অনূভুতি মনে পুষে রাখা তার বেস্ট-ফ্রেন্ডের প্রতি যে কিনা অন্য কারোর সম্পদ, তা ক্ষমাঅযোগ্য অপরাধ। তাই সে এটাও বলল যে, সে স্মিতার জীবন থেকে চলে যাবে চিরকালের জন্য, এ ভুলের শাস্তি হিসেবে।

কিন্তু স্মিতা যতই অমিতকে ভালোবাসুক না কেন, সত্য এটাই যে নীলকে ছাড়া তার এক মূহুর্তও কাটবে না। অমিত তার প্রহরে, কিন্তু নীল তার মূহুর্তের সঙ্গী।

অমিত স্মিতার প্রতি ভালোবাসার কোনো খামতি যে রেখেছিল তা নয়। তবু স্মিতা সেই সম্পর্ক ভেঙে দেয় কারণ সে আর আগের মতো সম্পর্কে 'মানিয়ে' উঠতে পারছিল না। এরপর নীলের সাথে স্মিতা ক্রমশই ঘনিষ্ট হতে থাকে কিন্তু নীল এবং তার মাঝে এক অদ্ভুত সম্পর্কের সমীকরণ রাখে যেখানে মানসিক, শারিরীক এবং সবরকম অন্তরঙ্গতারই অধিকার আছে কিন্তু তা অফিশিয়াল কোনো 'সম্পর্কে' আবদ্ধ নেই। বন্ধুতে এবং প্রেমের সম্পর্কের মধ্যবর্তী এক জটিল বোঝাপড়ার মধ্যে থেকে নীল এবং স্মিতা দিন কাটাতে লাগল।

নীল বরাবরই স্বার্থহীনভাবে ভালোবেসেছে স্মিতাকে। তার শুধু কয়েকটিই চাহিদা স্মিতার থেকে যা হল তার প্রতি একটু মননশীল হওয়া। একটু ব্যাক্তিগত সময়। সম্পর্কের জন্য স্মিতাকে জোড়াজুড়ি করেনা সে। কিন্তু স্মিতার সাথে দিনে সে এমন কিছুটা সময় কাটাতে চায়, যে সময়ে স্মিতা শুধু নীলের দিকেই মন দেবে, জীবনের অন্যান্য জিনিসগুলোকে ওইটুকু সময়ের জন্য পাশে সরিয়ে রেখে। কিন্তু স্মিতার খামখেয়ালি মন নিজেও নিজের গড়া সমীকরণ মানতে চাইল না একটা সময়ের পর। নীলের মনে অগাধ বিশ্বশ, ভালোবাসা, ঘনিষ্টতা তৈরী করেও সে আবারও এই সম্পর্কের মধ্যেও স্বাদহীনতা খুঁযে পেল। নীলের অন্তরঙ্গতার মধ্যেও তার মন অমিতের জন্য ব্যাকুল হতে লাগল। অমিত ততদিন সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ধাক্কা অনেকটাই সামলে উঠেছে আর নীল স্মিতার সাথে যথেষ্টই জালে জড়িয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় স্মিতার মনের কোণায় মাঝেমধ্যে আবারও অমিতের সাথে সম্পর্কে ফিরে যাওয়ার উদ্দীপনা তৈরী হতে লাগল। বহুদিনের থমকে  যাওয়া যোগাযোগ ভেঙে বাড়তে লাগল ঘনিষ্টতা। ক্রমে নীলের দিকের আবেগে ভাটা পড়ল।

সেই ভাটার টান যখন নীলের একমাত্র দাবী, সেই মূল্যবান এবং ব্যাক্তিগত কিছুটা সময়কেও ক্ষতিগ্রস্থ করতে লাগল, এবার নীলের আঘাত লাগল। বাড়তে লাগল চোখের জল, ক্রমে উত্তপ্ত বাক্যবিনিয়োগ, সম্পর্কে অবনতি, এবং...

স্মিতা ঠিক করেই ফেলল।

নীলের সাথে এভাবে এবং অমিতের থেকে দূরে সে আর থাকতে পারবে না। সে হোয়াটস্যাপে একদিন গভীর রাত্রে নীলকে এ কথা জানিয়েই দিল মর্মহীন বাক্যে। তারপর কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করেই ফোন অফ করে সে ঘুমিয়ে পড়ল।

পরের দিন সকালে বেশ ভোরেই ঘুম ভাঙল স্মিতার। জানলার শার্শি ভেদ করে স্বর্ণাভ সদ্য ওঠা রোদ তার মুখের ওপর পড়ছে। বাইরে একটি ঝলমলে দিনের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে।

স্মিতা জানলা খুলে দিল এবং ঘরটা আলো হাওয়ায় ভরে উঠল। স্মিতার ঘরে ঘড়ি নেই, আর ফোনটাও বন্ধ। ঠিক কটা বাজে সে জানেনা। তার এই সুন্দর দৃশ্য দেখে মনটা এতটাই ভালো হয়ে গেল যে তার আর ইচ্ছে করল না ফোন্টা খুলে সময় দেখার বা কোনো নোটিফিকেশন চেক করার।

প্রতিদিন স্মিতার মা অনেক সকালেই ওঠে, কারণ বাবা অনেক সকালে অফিসে বেড়িয়ে যায়।

স্মিতা উঠে বিছানা বালিশ গুছিয়ে মুখ ধুয়ে নিল। ব্রাশ করল। ব্রাশ হয়ে যাওয়ার পর স্মিতা যখন মাকে এক কাপ চা দেওয়ার জন্য হাঁকটা দিতে যাবে তখন তার একটা আশ্চর্য জিনিস খেয়াল হল।

বেশ কিছুক্ষণ উঠেছে সে কিন্তু এতক্ষণে তার মায়ের কোনো সাড়াই সে পায়নি। ঘরটা খুবই নিশ্চুপ লাগছে।

স্মিতা 'মা' করে ডাকল কয়েকবার। বাড়িটা তন্নতন্ন করে খুঁজল। কিন্তু মায়ের কোনো চিহ্ন নেই কোথাও। ঘরের সব জিনিস যেমন ছিল তেমনই রয়েছে। যেন কিছুই হয়নি।

স্মিতার মনে হল যে হয়ত মা বাইরে আশেপাশে কোথাও গিয়ে থাকবে।

স্মিতা সদর দরজা খুলে বাইরে এল। আশেপাশে কেউ নেই। সে আর অনর্থক সকালবেলা ডাকাডাকি করল না চেঁচিয়ে। সামনে রাস্তায় কয়েকটা দোকান আছে, সেখানে থাকতে পারে ভেবে সে একটা স্যান্ডেল পড়েই বেড়িয়ে গেল।চারিদিকটা একটু বেশীই থমথমে মনে হচ্ছে। স্মিতা লক্ষ্য করল যে, পাখির শব্দ ছাড়া সেরকম কোনো কোনো শব্দই সে পাচ্ছেনা। অথচ মনে তো হচ্ছে সকাল ৮টার কম বাজে না। এতক্ষণে রাস্তাঘাটে লোকজন থাকার কথা।

একটু এগিয়ে যেতেই পাড়ার বড়ো রাস্তায় বেশ কয়েকজন লোক দেখা গেল। একজন রিক্সার চেন ঠিক করছে। একজন সাইকেল চালিয়ে চলে গেল। রাস্তার ওপারে চায়ের আর মিষ্টির দোকান, সেখানেও লোকজনের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। গুঞ্জন ভেসে আসছে।

কিন্তু আরেকটু কাছে যেতেই স্মিতা যেটা দেখতে পেল, তাতে তার পিঠ থেকে একটা ঠান্ডা শিহরণ নেমে গেল। তার দেহের সব লোমগুলো খাঁড়া হয়ে উঠল এবং তার সব ইন্দ্রীয় সজাগ হয়ে উঠল।

যে লোকটা চেন ঠিক করছে, যে লোকগুলো চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছে, এমনকী মিষ্টির দোকানের দোকানদার, প্রত্যেকের মুখের অবয়ব একজনেরই। প্রত্যেকের মুখই নীলের সাথে হুবুহু মিলে গেছে। তাদের কারোর মুখের প্রতিকৃতিতে কোনো পার্থক্য নেই! শুধু তাই নয়, প্রত্যেকেরই বুকের বাঁদিক বরাবর রক্ত ঝড়ছে। একটা লোক এইমাত্র বোধহয় স্নান করে গামছা পড়ে খালি গায়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। তার মুখও নীলের সাথেই সদৃশ। স্মিতা দেখল, তারও বুকের বাঁদিকে একটি গভীর ক্ষতচিহ্ন। মনে হচ্ছে যেন কেউ তার হৃদপিন্ডসমেত সেখানকার মাংশ খুবলে তুলে নিয়েছে। তার সেই ক্ষতচিহ্ন থেকে গলগল করে রক্ত বেয়ে পড়ছে। অন্য সকলের জামা-শার্টও রক্তে ভিজে গেছে, তাও তারা নিজেদের মতো  কাজ করে চলেছে, হাসি ঠাট্টা করছে, যেন কিছুই হয়নি।

স্মিতা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করল যে, একটি চরম ভুল যায়গায় এসে পড়েছে সে। এখানে তার থাকা উচিত নয়। এখানে তার উপস্থিতি একেবারেই কাম্য নয়।

সে আস্তে আস্তে পিছু হঠতে শুরু করল সবার অলক্ষ্যে। তার বুক ধরাস ধরাস করছে। কপাল বেয়ে ঘামের ফোঁটা নামছে তার। স্মিতার এখন জানার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই যে এসব কী বা কেন হচ্ছে। তার বোঝার মনষ্কামনা নেই এসবের পেছনের যুক্তিসমূহ। সে শুধু মুক্তি চায়, এই বাস্তব থেকে যা সে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে।

সে ধীরে ধীরে পেছন ফিরল, কিন্তু হায় কপাল। তার ঠিক বাড়ির গেটের সামনে রোজদিনের গার্বেজ কালেকশন করার মিউনিসিপ্যালটির কর্মচারী তার গাড়িটি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যার মুখায়ববেও নীল। এভাবে স্মিতা গেটের দিকে পা বাড়াতে পারবেনা। তাহলে তাকে নীলের মুখোমুখী হতে হবে।

স্মিতা মনের মধ্যে দিশেহারা হয়ে পড়ল। হতবুদ্ধি হয়ে সে রাস্তা থেকে দ্রুতপদে চলতে লাগল। স্মিতা চেষ্টা করল যাতে তার চলন ও আচরণ দেখে ঐ নীলরূপী মানুষগুলোর মনে কোনো সন্দেহ না জাগে। কিন্তু সে নিজেও জানে যে, সে যেট করতে চাইছে সেটা করতে তার শরীর কিছুতেই সায় দিচ্ছেনা। তার হাটার গতি, তার অস্বাভাবিক ব্যাবহার সবকিছুরই অবাধ প্রকাশ পাচ্ছে। তবু সে এদিক-সেদিক না দেখে চলতে লাগল।

স্মিতা কিন্তু নিজেও জানেনা যে সে চলছে কম, দৌড়চ্ছে বেশী। এদিকে এমন এক অস্বাভাবিক আচরণ ঐ নীলের দলের চোখ এড়াতে পারলনা। তারা স্মিতাকে দেখে প্রথমে কিছু বুঝতে পারলনা, কিন্তু তাদের মধ্যে গুঞ্জন আরো বেড়ে গেল।

স্মিতা এখন ওদের ছেড়ে দূরে একটা গলি ধরে যাচ্ছে। এখানে লোকজন বিশেষ আসেনা। দুপাশে গা ঘেষে বাড়ি। একজন বাড়ির বারান্দায় কাপড় শুকোতে দিচ্ছিল, সেই লোকটার মুখও নীলের। সে স্মিতাকে দেখে চমকে উঠল।

স্মিতা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগপ। মনে মনে ঈশ্বরকে ডেকে করজোড়ে প্রার্থনা করতে লাগল যাতে সে মুক্তি পায়। এই সবকিছুই একটা দুঃস্বপ্নের বেশী যেন কিছুই না হয়। সে বুঝতে পারছে এখন অল্প অল্প যে শহরের, সম্ভবত পৃথিবীর সব মানুষই নীলে পরিণত হয়ে গিয়েছে। চারিদিকে শুধু নীল আর নীল। নীল তাকে ছেয়ে আছে। স্মিতাকে ধরবার জন্য তারা বদ্ধপরিকর। তারা চায়না স্মিতাকে এ জগতে। তারা পেলে স্মিতাকে ছাড়বেনা। এরা সকলে ক্রোধে দাহ্যমান। বুকের ঐ ক্ষতটা যে স্মিতাই তৈরী করেছে তাদের মনে এটাই শিকড় ছড়িয়ে রয়েছে।

গলিটা সামনে একটা মেন রোডে গিয়ে উঠল। স্মিতাও মেন রোডের ওপর এসে পড়ল। সে এতটাই হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছে যে সে ভুলেই গেছে যে তার মেন রোডে আসা একদমই উচিত হয়নি। এখানে সে সহজেই দৃষ্টিগোচর হয়ে পড়বে।

কিন্তু সেই ভুল শোধরানোর সময় স্মিতা পেলনা। সে ডানদিকে ফিরে দেখল তার সামনে, পুরো রাস্তা জুড়ে কয়েক লক্ষ নীল হাতে ইট, লাঠি বা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই মিছিল যে তারই বুরুদ্ধে হচ্ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এবং স্মিতা বুঝতে পেরেছে যে সে ভুল সময়ে আবারও একবার সে ভুল জায়গায় এসে পড়েছে।

তাকে দেখতে পেয়েই এই লক্ষের ভিড়টা উন্মত্ত ও পাগল হয়ে উঠল। তারা স্মিতাকে লক্ষ করে পাগলের মতো দৌড়ে আসতে লাগল। স্মিতা উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়তে লাগল। তার সত্যিই আজ নিস্তার নেই। স্বয়ং ঈশ্বরও বোধহয় পারলেন না আর এই অন্ধ এবং উন্মাদ নীলের স্মিতাকে ধরার বদ্ধপরিকর মনোভাব থেকে বাঁচাতে। ইতিমধ্যে আশেপাশে বাড়ি থেকেও নীলের দল পিপীলিকার মতো পিলপিল করে বেড়িয়ে আসছে পাগলের মতো। তাদের হাতে যা যা সম্ভব আঘাত করার মতো সবই রয়েছে।  খুন্তি, লাঠি সব।

স্মিতার মাথায় আর একটা শব্দ নেই। সেশুধু দৌড়চ্ছে, দৌড়চ্ছে আর দৌড়চ্ছে। জানেনা এভাবে কতক্ষণ সে পারবে।

ইতিমধ্যে সামনে থেকেও নীলের ঢল আসতে শুরু করল। স্মিতা পাগলপ্রায় হয়ে গেল এ দেখে। ভয়ে এবং উত্তেজনায় তার চোখে জলও চোখেই যুকিয়ে গিয়েছে। সে বাঁদিকেই একটা সরু গলি দেখে ঢুকে পড়ল এবং বেশ কিছুদূর গিয়ে একটা ভাঙা পরিত্যক্ত টিনের বাড়ির খোলা দরজা দেখে ভেতরে ঢুকে পড়ল এবং দরজা এঁটে মিশকালো অন্ধকারে ঘুপচি কোণে দাঁড়িয়ে রইল।

সে এখনো জানেনা যে এ যাত্রা বেঁচেছে কিনা, কারণ সবাই দেখেছে তাকে এ গলিতে ঢুক্তে। নিশ্চই এক্ষুণি এসে পড়বে। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেল স্মিতা কোনো শব্দ পেলনা। এদিকে স্মিতা কাঁদুক না কাঁদুক, সে একটাই উত্তেজিত যে অঝোড়ে কাঁদলে যে মাঝে মাঝে হেচকি ওঠে, দম নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তার সেরকম হয়েই চলেছে। সে চায়না শব্দ করতে পাছে ওরা শুনতে পায়। কিন্তু ও কিছুতেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেনা।

এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কাটল। স্মিতার যদিও পুরোপুরি শান্ত হতে একটু সময় লাগবে। সে আশেপাশে তাকিয়ে দেখতে লাগল। টিনের ঘরটার চারিদিকে ফুঁটো। আলো ঢুকছে সেইসব ফুঁটোগুলো দিয়ে। হঠাৎই পাশের একটি ছিদ্রের দিকে চোখ গেল স্মিতার। ছিদ্রের ওপারে একটা চোখ দেখা যাচ্ছে না?! হয়ত তার মনের ভুল। স্মিতা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করল... হ্যাঁ এটা তো চোখ একটা! তাকেই দেখছে! কেউ তাকে অনেক্ষণ ধরেই ছিদ্রের ওপার থেকে দেখছিল কিন্তু লোকটা তাকে বুঝতেও দেয়নি।

এবার লোকটাও বুঝতে পেরেছে স্মিতা তাকে দেখেছে। চোখটা সরে গেল  স্মিতা খুব ভালোভাবেই টিনের দেওয়ালের ওপার থেকে লোকের দলের আনাগোনা টের পেল। তারা বুঝে গেছে যে স্মিতা এখানেই আছে। স্মিতার গলা থেকে এক বিকট ভারী গোঙানির শব্দ বেরোল যা সে নিজেও চিনতে পারল না। সে দৌড়ে বেড়িয়ে গেল অন্য একটি দরজা থেকে। সামনেই একটা অ্যাপার্টমেন্টের মধ্যে ঢুকে সিড়ি দিয়ে উঠতে লালল রূদ্ধশ্বাসে। পেছন থেকে সব ভেঙেচুরে আসছে যেন তাড়া করছে ওরা। স্মিতার পা ভারী হয়ে আসছে সে জানেনা কেন। খুব কষ্টে সে ছাদে পৌছে গেট আটকে দিল।

এত ওপর থেকে পুরো শহরটা দেখা যাচ্ছে। চারিদিকে বাতাসে শুধু চিৎকার এবং হইচই। সারা শহর যেন ক্ষোভে ফেঁটে পড়েছে। সকলে তারা কোনো অবরোধ ঘোষণা করেছে যেন। নীচে স্মিতা বুঝতে পারল যে লক্ষাধিক মানুষ জমায়েত হয়েছে। তারা  সকলে স্মিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। স্মিতা এগিয়ে গেল ছাদের ধারের দিকে দেখতে যে নীচে ঠিক কি হচ্ছে। সে যা দেখল তা তার বিশ্বাসই হলনা। অন্ততঃ কয়েক লক্ষ মানুষ জড়ো হয়েছে। তাদের বেশ কয়েকজন মানুষ বিল্ডিংয়ের পাইপ বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে। কেউ ছাদের দিকে লক্ষ্য করে আগুন ধরানো অ্যালকোহলের বোতল ছুড়ে মারছে।

ইতিমধ্যে স্মিতা টের পেল যে তার পেছনে ছাদের গেটে ধাক্কা পড়তে আরম্ভ করেছে। কতক্ষণ সেটা এই পাগলপ্রায় লোকগুলোকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে সে জানেনা। স্মিতার আর কোথাও যাওয়ার মতো সুযোগও নেই। সে অপারগ হয়্র, দিশাহীন হয়ে, বিভ্রান্ত হয়ে, এই বিশাল আকাশের নীচে, এক পশুন্যায় হিংস্র, লক্ষাধিক জনতার ভিড়ের বাঁধভাঙা ক্ষোভের থেকে মাত্র এক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে। স্মিতা নীলকে জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। এখন নীল তার চারিদিকে। স্মিতা তাকে ছাড়তে চাইলেও সে তাকে কিছুতেই ছাড়বেনা। সে বদলা চায়... হিসেব চায়... শাস্তি চায়।

এক বিকট শব্দে পেছনের গেটটা ভেঙে গেল। স্মিতার সামনে আর কোনো রাস্তা নেই। তার মস্তিষ্ক এখন সম্পূর্ণ শূন্য। সে ছলছলে চোখে ওপরে আকাশের দিকে তাকাল, তারপর চোখের পলকদুটো বন্ধ করল। নিজেকে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিল সে। কয়েকশ ক্রোধন্মত্ত হাতের কাছে নিজেকে সপে দিল সে, সম্পূর্ণভাবে। এই তার জীবনের পথ চলার শেষ...

ঘুম ভেঙে গেল স্মিতার। ভয়ে তার সমগ্র শতীর ঘেমে গিয়েছে। সেই ঘামে ভিজে গিয়েছে মাথার নীচের বালিশও সেটা স্মিতা অনুভব করল। তার বুক এখনো অস্বাভাবিকভাবে ধুকপুক করছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। সে কিছুক্ষণ ওভাবেই শুয়ে রইল, যতক্ষণ না সে একটু শান্ত হচ্ছে আর স্বপ্নের ঘোর কাটিয়ে বাস্তবে ফিরতে পারছে  একটু সম্বিত ফিরতে সে উঠে বসল।

জানলার শার্শি ভেদ করে স্বর্ণাভ সদ্য ওঠা রোদ তার মুখের ওপর পড়ছে। বাইরে একটি ঝলমলে দিনের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে।

স্মিতা জানলা খুলে দিল এবং ঘরটা আলো হাওয়ায় ভরে উঠল। স্মিতার ঘরে ঘড়ি নেই, আর ফোনটাও বন্ধ। ঠিক কটা বাজে সে জানেনা। তার এই সুন্দর দৃশ্য দেখে মনটা এতটাই ভালো হয়ে গেল যে তার আর ইচ্ছে করল না ফোন্টা খুলে সময় দেখার বা কোনো নোটিফিকেশন চেক করার।

প্রতিদিন স্মিতার মা অনেক সকালেই ওঠে, কারণ বাবা অনেক সকালে অফিসে বেড়িয়ে যায়।

স্মিতা উঠে বিছানা বালিশ গুছিয়ে মুখ ধুয়ে নিল। ব্রাশ করল। ব্রাশ হয়ে যাওয়ার পর স্মিতা যখন মাকে এক কাপ চা দেওয়ার জন্য হাঁকটা দিতে যাবে তখন তার একটা আশ্চর্য জিনিস খেয়াল হল।

বেশ কিছুক্ষণ উঠেছে সে কিন্তু এতক্ষণে তার মায়ের কোনো সাড়াই সে পায়নি। ঘরটা খুবই নিশ্চুপ লাগছে।

স্মিতা 'মা' করে ডাকল কয়েকবার। বাড়িটা তন্নতন্ন করে খুঁজল। কিন্তু মায়ের কোনো চিহ্ন নেই কোথাও। ঘরের সব জিনিস যেমন ছিল তেমনই রয়েছে। যেন কিছুই হয়নি।

স্মিতার মনে হল যে হয়ত মা বাইরে আশেপাশে কোথাও গিয়ে থাকবে।

স্মিতা সদর দরজা খুলে বাইরে এল। এসে যা দেখল, তারপর স্মিতার মস্তিষ্ক, বোধবুদ্ধি, চেতনা আবার সব শূন্য হয়ে গেল। সে বুঝল, তার আজ নিস্তার নেই।

এক অবসন্ন ভাব তাকে গ্রাস করে সম্পূর্ণভাবে আচ্ছন্ন করে ফেলল। হাটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ে তার মুখ থেকে একটাই অস্ফূট শব্দ বেরোল,

"ঈশ্বর..."

একটা ছোট্ট একখন্ড দ্বীপে স্মিতার এই বাড়িটা। তাকে ঘিরে রয়েছে ঝড়ের আগের উত্তাল ক্রোধে ফুটন্ত মহাসাগর। আর দূরে কুয়াশা ভেদ করে, বজ্রনিনাদের মধ্যে হাল্কা দেখা যাচ্ছে, এক পর্বতন্যায়, বিশাল, চলমান, দানবদেহী মানুষ, সাহরের ঢেউয়ের ওপর তার প্রকাণ্ড পা গুলোকে ফেলতে ফেলতে এগিয়ে আসছে... তার মুখাবয়ব... এত দূর থেকেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে...

Comments

Popular posts from this blog

Being Innovative

Universe